চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালকে যানজটমুক্ত পরিচ্ছন্ন হাসপাতালে পরিণত করা হবে: মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন

চট্টগ্রাম, রোববার: রোগীদের চিকিৎসাসেবা আরও সহজ, সুশৃঙ্খল ও মানবিক করতে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সংলগ্ন এলাকাকে যানজটমুক্ত, পরিচ্ছন্ন ও আধুনিক ব্যবস্থাপনার আওতায় আনার ঘোষণা দিয়েছেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ও হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ডা. শাহাদাত হোসেন।
রোববার সকালে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সম্মেলন কক্ষে হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি হিসেবে প্রথম সভায় অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের সাবেক শিক্ষার্থী হিসেবে হাসপাতালের উন্নয়ন ও সেবার মান বৃদ্ধিতে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার আশ্বাস দেন মেয়র। সভায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ তসলিম উদ্দীন হাসপাতালের বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যত পরিকল্পনা তুলে ধরেন।
মেয়র বলেন, হাসপাতালে আগত রোগী ও স্বজনদের সবচেয়ে বড় ভোগান্তির একটি হলো তথ্য বিভ্রান্তি ও দিকনির্দেশনার অভাব। অনেকেই হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগ, পরিচালকের কার্যালয় কিংবা মেডিকেল কলেজের ভবন সহজে খুঁজে পান না। এ সমস্যা সমাধানে হাসপাতালের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে দিকনির্দেশনামূলক সাইনেজ, অ্যারো মার্কিং ও তথ্যবোর্ড স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হবে। এতে রোগী ও স্বজনদের অপ্রয়োজনীয় হয়রানি কমবে এবং হাসপাতালের সার্বিক শৃঙ্খলা বৃদ্ধি পাবে।
ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আশপাশের পুরো এলাকা যানজটমুক্ত রাখতে সিটি করপোরেশন, ট্রাফিক বিভাগ ও প্রশাসনের সমন্বয়ে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। চকবাজার অলি খাঁ মসজিদ থেকে প্রবর্তক মোড় পর্যন্ত এলাকায় কোনো ধরনের অবৈধ যানজট বা ফুটপাত দখল বরদাশত করা হবে না। ইতোমধ্যে সিটি করপোরেশনের ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে একাধিক অভিযান পরিচালিত হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও তা অব্যাহত থাকবে।
তিনি বলেন, হাসপাতালের প্রধান সমস্যাগুলোর একটি হলো অনিয়ন্ত্রিত অ্যাম্বুলেন্স চলাচল ও ভাসমান দোকান। সড়কে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকা অ্যাম্বুলেন্স, ডাব ও ভ্রাম্যমাণ দোকানের কারণে রোগী পরিবহনে চরম ভোগান্তি সৃষ্টি হচ্ছে। এ অবস্থা নিরসনে নির্দিষ্ট স্থানে অ্যাম্বুলেন্স পার্কিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে এবং ফুটপাত গ্রিলের মাধ্যমে সুরক্ষিত করা হবে। একইসঙ্গে টোকেনভিত্তিক অ্যাম্বুলেন্স ব্যবস্থাপনা চালুর বিষয়েও চিন্তাভাবনা চলছে।
মেয়র আরও বলেন, চট্টগ্রামে স্বাস্থ্যসেবার চাপ কমাতে বিকল্প হাসপাতালগুলোকেও কার্যকর ও আধুনিক করতে হবে। রেলওয়ে হাসপাতালের মতো বিদ্যমান হাসপাতালগুলোকে উন্নত করা গেলে রোগীদের চাপ কিছুটা কমবে। এজন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, রেলওয়ে মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয়ে বৈঠক করার প্রয়োজন রয়েছে।
সভায় তিনি আরও জানান, কালুরঘাট এলাকায় সিটি করপোরেশনের জায়গায় সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে আধুনিক মানের একটি জেনারেল হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। রাজধানীর কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের আদলে নির্মিতব্য এ হাসপাতাল চট্টগ্রামের স্বাস্থ্যসেবায় নতুন মাত্রা যোগ করবে। এছাড়া বন্দর-পতেঙ্গা এলাকায়ও অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী একটি বড় হাসপাতাল স্থাপনের উদ্যোগ নিচ্ছেন বলে তিনি উল্লেখ করেন।
হাসপাতাল এলাকার সৌন্দর্যবর্ধনের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে মেয়র বলেন, অলি খাঁ মসজিদ থেকে প্রবর্তক মোড় পর্যন্ত মিড আইল্যান্ডে বৃক্ষরোপণ ও সবুজায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বর্ষা মৌসুমকে সামনে রেখে এখনই গাছ লাগানোর উপযুক্ত সময় উল্লেখ করে তিনি নগরকে আরও পরিবেশবান্ধব করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
পরিচ্ছন্নতা ব্যবস্থার উন্নয়নে মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের যৌথ উদ্যোগে ২০ জন পরিচ্ছন্নতাকর্মী নিয়োগের প্রস্তাব দেন। এর মধ্যে ১০ জন সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে এবং আরও ১০ জন আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়োজিত থাকবে। তিনি জানান, তিন শিফটে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে— সকাল ৬টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত ৮ জন, দুপুর ২টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত ৬ জন এবং রাত ১০টা থেকে ভোর পর্যন্ত আরও ৬ জন দায়িত্ব পালন করবেন। কর্মীরা ট্রলি নিয়ে হাসপাতালের বিভিন্ন স্থানে ঘুরে ময়লা দেখামাত্র তা অপসারণ করবেন এবং নিয়মিত ঝাড়ু ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ চালিয়ে যাবেন। একইসঙ্গে একটি মনিটরিং টিম গঠন করে কর্মীদের কার্যক্রম তদারকি করা হবে, যাতে কেউ দায়িত্বে অবহেলা করতে না পারে। বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে হাসপাতালের টয়লেট ব্যবস্থাপনার ওপর। প্রয়োজনে আলাদা বাজেট দিয়ে টয়লেট সংস্কার ও আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে, যাতে রোগী ও স্বজনরা স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ পান।
ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, হাসপাতাল এলাকায় ফেলে রাখা ডাবের খোসা ও বর্জ্য এখন ডেঙ্গু-চিকুনগুনিয়ার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। তাই পরিচ্ছন্নতা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাকে একসঙ্গে গুরুত্ব দিতে হবে। হাসপাতালের অভ্যন্তরে আনসার সদস্য ও সংশ্লিষ্ট কর্মীদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শৃঙ্খলাবদ্ধ ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা হবে বলেও তিনি জানান।
সভায় চট্টগ্রাম-৯ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আবু সুফিয়ান বলেন, এরই মধ্যে তিনি হাসপাতাল পরিচালককে সঙ্গে নিয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এলাকা পরিদর্শন করেছেন এবং বিভিন্ন সমস্যা চিহ্নিত করে লিখিতভাবে নোট নিয়েছেন। তিনি বলেন, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের সাবেক শিক্ষার্থী এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করায় সবাই আশাবাদী যে হাসপাতালের উন্নয়নে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।
তিনি আরও বলেন, চট্টগ্রামের জন্য সৌভাগ্যের বিষয় হলো অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী চট্টগ্রামের সন্তান এবং তিনি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের যেকোনো সমস্যা দ্রুত সমাধানে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন। একইসঙ্গে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সঙ্গেও এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানান তিনি।
সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আবু সুফিয়ান বলেন, একজন সংসদ সদস্য হিসেবে জনগণের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে তার দায়-দায়িত্ব আরও বেশি। পার্লামেন্টে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ থাকায় হাসপাতালের যেকোনো সমস্যা সমাধানে তিনি প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেবেন। হাসপাতালের উন্নয়ন ও সেবার মান বৃদ্ধিতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
তিনি বলেন, স্বাস্থ্যসেবা মানুষের মৌলিক ও সাংবিধানিক অধিকার। নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও চিকিৎসকরা নিরলসভাবে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন এবং বিপুল সংখ্যক মানুষ চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে চিকিৎসাসেবা পাচ্ছেন। তাই বিদ্যমান সমস্যাগুলো দূর করে হাসপাতালের সার্বিক পরিবেশ ও সেবার মান আরও উন্নত করতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।
সভায় উন্মুক্ত আলোচনায় কমিটির সদস্যবৃন্দ বলেন, হাসপাতালটি মূলত ৮৫০ শয্যার ধারণক্ষমতা বিবেচনা করে নির্মাণ করা হলেও বর্তমানে এখানে ৩০০০ থেকে ৪০০০ রোগীকে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে । ধারণক্ষমতার প্রায় চারগুণ রোগী থাকায় হাসপাতালের পানির চাহিদা বিপুল পরিমাণে বেড়ে গেছে এবং সুয়ারেজ সিস্টেম ও পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থার ওপর তীব্র চাপ পড়ছে, যা অনেক সময় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় । হাসপাতালের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিচ্ছন্নতা দ্রুত নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয় এবং ক্যাম্পাসে গাছপালা বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়
সভায় অংশ নেন জেলা মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের প্রতিনিধি বীর মুক্তিযোদ্ধা একরামুল করিম, চট্টগ্রাম প্রাইভেট প্র্যাকটিশনার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিনিধি অধ্যাপক (ডা.) ইমরান বিন ইউসুফ, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ জসিম উদ্দীন, চট্টগ্রামের পুলিশ কমিশনারের ডিসি উত্তর আমিরুল ইসলাম, বিভাগীয় পরিচালক স্বাস্থ্য, অধ্যাপক ডা. আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ, চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের সভাপতি জাহিদুল করিম কচি, গণপূর্ত বিভাগের প্রতিনিধি, চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনারের প্রতিনিধি, চট্টগ্রাম আইনজীবী সমিতির মনোনীত প্রতিনিধি, বিএমএ চট্টগ্রামের মনোনীত প্রতিনিধি , ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বারস অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির মনোনীত প্রতিনিধি , ডা. কামরুন নাহার দস্তগীর, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আরবান ফিজিশিয়ান ডা. মোহাম্মদ সামিউল করিম চৌধুরী, নার্সিং প্রতিনিধি প্রমুখ।