চট্টগ্রামে অ্যাড ভিশন বাংলাদেশের আলোচনা সভা, র‍্যালি ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠিত

মশার প্রজননস্থল ধ্বংস ও পরিচ্ছন্ন পরিবেশ গড়তে নাগরিক আন্দোলনের আহ্বান
চট্টগ্রামে অ্যাড ভিশন বাংলাদেশের আলোচনা সভা, র‍্যালি ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান
ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া প্রতিরোধে শুধু মশা নিধন নয়, মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং প্রতিটি পরিবারে সচেতনতা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন বক্তারা।অ্যাড ভিশন বাংলাদেশের আলোচনা সভা, র‍্যালি ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান চট্টগ্রাম শিল্পকলা একাডেমির গ্যালারী হলরুমে গত ২৯ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় অনুষ্ঠিত হয়।

বক্তারা বলেছেন, ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হলে সরকারের পাশাপাশি নাগরিকদেরও নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্ব নিতে হবে। কারণ মশার বিরুদ্ধে লড়াই শুধু ওষুধ ছিটিয়ে নয়, শুরু করতে হবে মানুষের ঘর, ছাদ, আঙিনা ও মহল্লা থেকে।
ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযান কোনো মঞ্চ থেকে নয়, শুরু হোক আমাদের নিজ নিজ ঘর থেকে।এই আহ্বানকে সামনে রেখে পরিবেশ উন্নয়ন ও স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা অ্যাড ভিশন বাংলাদেশ-এর উদ্যোগে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম জেলা শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া প্রতিরোধ এবং পরিবেশ সুরক্ষায় আলোচনা সভা, সচেতনতামূলক র‍্যালি ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সাবরিনা আফরোজার সাবলীল পরিচালনায় স্বাগত বক্তব্য রাখেন প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা মাসুদ রানা ।

 

সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন সাজেদুল আলম মিল্টন। পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়।
অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন বিশিষ্ট ইতিহাস গবেষক সোহেল মোহাম্মদ ফখরুদ্দিন। বিশেষ অতিথি ছিলেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বেলাল উদ্দিন , ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ মোজাম্মেল হোসেন মাসুম ।প্রধান বক্তা ছিলেন সাংবাদিক, লেখক ও গবেষক মোহাম্মদ কামাল উদ্দিন। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন এম এ সবুর। বক্তব্য রাখেন চট্টগ্রাম রিপোর্টার্স এ্যাসোসিয়েশন এর সদস্য সাংবাদিক রতন বড়ুয়া, সাংবাদিক আকতার হোসেন শাকিল, শিক্ষক কুতুব উদ্দিন বখতেয়ার, এইস এম সোহেল, কক্সবাজার জেলা এ্যাড ভিশন এর সভাপতি মামুনুর রশিদ, সেক্রেটারি মোহাম্মদ আলমগীর , সাবেক ব্যাংকার দুলাল কান্তি বড়ুয়া, এস এম আবু তাহের চৌধুরী প্রমুখ ।
এছাড়া বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধি, সামাজিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ, স্বেচ্ছাসেবী, সাংবাদিক ও সচেতন নাগরিকরা অনুষ্ঠানে অংশ নেন।

 

ডেঙ্গু শুধু রোগ নয়, এটি নাগরিক দায়িত্বেরও প্রশ্ন আলোচনায় বক্তারা বলেন, ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া শুধু একটি স্বাস্থ্যগত সমস্যা নয়; এর সঙ্গে নগর ব্যবস্থাপনা, পরিচ্ছন্নতা, পরিবেশ সুরক্ষা, পানি নিষ্কাশন এবং নাগরিক সচেতনতার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।
একদিকে মশা নিধন কার্যক্রম চলবে, অন্যদিকে যদি মানুষের বাড়ি, ছাদ, নির্মাণাধীন ভবন কিংবা পরিত্যক্ত জায়গায় পানি জমে থাকে, তাহলে নতুন মশার জন্ম বন্ধ করা সম্ভব নয়।তাই বক্তারা বলেন, মশা মারার পাশাপাশি মশার জন্মস্থান ধ্বংস করাই হতে হবে ডেঙ্গু প্রতিরোধের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। মশা ছোট, কিন্তু বিপদ বড় ।

 

বক্তারা আরো বলেন, এডিস মশা আকারে ছোট হলেও এর কারণে তৈরি হতে পারে বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি। বাড়ির ছাদে ফুলের টব, টবের নিচের পাত্র, পুরোনো বালতি, বোতল, কৌটা, পরিত্যক্ত টায়ার, নারকেলের খোসা কিংবা নির্মাণসামগ্রীর মধ্যে সামান্য পানি জমেও মশার প্রজননস্থল তৈরি হতে পারে।তাই প্রতিটি পরিবারকে নিয়মিত নিজেদের বাড়ি ও আশপাশ পরীক্ষা করার আহ্বান জানানো হয়।বক্তারা বলেন,পানি অল্প হতে পারে, কিন্তু বিপদ অল্প নয়।

 

মশার জন্য ফাইভ-স্টার হোটেল নয় অনুষ্ঠানে ডেঙ্গু সচেতনতার পাশাপাশি হাস্যরসের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ বার্তাও তুলে ধরা হয়।

বক্তারা বলেন, মানুষ নিজের বাড়িকে সুন্দর ও আরামদায়ক করতে অনেক অর্থ ব্যয় করেন। কিন্তু অসচেতনতার কারণে বাড়ির কোথাও পানি জমিয়ে রেখে যদি এডিস মশার জন্য নিরাপদ আবাস তৈরি করা হয়, তাহলে সেটিই হতে পারে বিপদের কারণ।বক্তারা বলেন, মশার ভোঁ ভোঁ শব্দ হয়তো বিরক্তিকর, কিন্তু তার চেয়েও ভয়ংকর হলো সেই মশার মাধ্যমে রোগের বিস্তার। তাই মশাকে ঘরে প্রবেশের আগেই তার জন্মস্থান ধ্বংস করতে হবে।

প্রধান বক্তা সাংবাদিক, লেখক ও গবেষক মোহাম্মদ কামাল উদ্দিন বলেন, ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে লড়াই কোনো একক প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির পক্ষে সম্ভব নয়। এই লড়াইকে নাগরিক আন্দোলনে পরিণত করতে হবে। আর সেই আন্দোলনের প্রথম ঠিকানা হতে হবে আমাদের নিজ নিজ ঘর।তিনি বলেন, প্রতিদিন মাত্র পাঁচ মিনিট নিজের বাড়ি, ছাদ, বারান্দা ও আশপাশে নজর দিলেই আমরা অনেক মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করতে পারি।

 

তিনি আরও বলেন, আমরা শুধু সরকারের দিকে তাকিয়ে থাকব না। সরকার তার দায়িত্ব পালন করবে, সিটি কর্পোরেশন তার দায়িত্ব পালন করবে, আর নাগরিক হিসেবে আমরাও আমাদের দায়িত্ব পালন করব। আমার বাড়ি, আমার দায়িত্ব; আমার মহল্লা, আমার দায়িত্ব; আমার শহরও আমার দায়িত্ব।গণমাধ্যমের ভূমিকার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে সংবাদমাধ্যমকে শুধু রোগী ও মৃত্যুর খবর প্রকাশের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে মানুষের করণীয় বিষয়গুলোও নিয়মিত তুলে ধরতে হবে।

 

উদ্বোধক সোহেল মোহাম্মদ ফখরুদ্দিন
অনুষ্ঠানের উদ্বোধক ইতিহাস গবেষক সোহেল মোহাম্মদ ফখরুদ্দিন বলেন, “একটি সুস্থ ও সুন্দর সমাজ শুধু অবকাঠামো দিয়ে তৈরি হয় না। মানুষের সচেতনতা, পরিচ্ছন্নতা ও দায়িত্ববোধই একটি নগরীকে সত্যিকার অর্থে বাসযোগ্য করে তোলে।”
তিনি ডেঙ্গু প্রতিরোধে পরিবার ও সামাজিক সংগঠনগুলোকে আরও সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানান।বিশেষ অতিথি এম এ সবুর বিশেষ অতিথি এম এ সবুর বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি সামাজিক সংগঠন ও সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ অত্যন্ত জরুরি। সচেতনতার বার্তা ঘরে ঘরে পৌঁছে দিতে হবে।তিনি সবাইকে নিজের বাড়ি ও আশপাশ পরিষ্কার রাখার আহ্বান জানান।সভাপতির বক্তব্য
সভাপতি সাজেদুল আলম মিল্টন বলেন, শুধু সভা, সেমিনার ও আলোচনা করলেই ডেঙ্গু প্রতিরোধ হবে না। আমাদের কথা অনুযায়ী কাজ করতে হবে। আজকের অনুষ্ঠান থেকে ফিরে প্রত্যেককে নিজের বাড়ি ও আশপাশ পরীক্ষা করতে হবে।তিনি বলেন, “নিজে নিরাপদ থাকার পাশাপাশি প্রতিবেশীকেও নিরাপদ রাখার দায়িত্ব আমাদের সবার।
অনুষ্ঠানের শেষপর্বে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার ঝুঁকি কমাতে নাগরিক সচেতনতা জোরদার, মশার প্রজননস্থল ধ্বংস এবং পরিচ্ছন্ন, সবুজ ও নিরাপদ চট্টগ্রাম গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়।বক্তারা বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধ কোনো একক ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা সরকারের একার দায়িত্ব নয়; এটি একটি সম্মিলিত সামাজিক দায়িত্ব।